থমকে আছে ডুয়েলগেজ রেলপথের উদ্যোগ

| আপডেট :  ২২ মার্চ ২০২২, ১১:৪৪  | প্রকাশিত :  ২২ মার্চ ২০২২, ১১:৪৪

বাংলাদেশ-ভারত রেলপথ যোগাযোগ বাড়াতে গত কয়েক বছরে নেওয়া হয়েছে নানামুখী উদ্যোগ। দুই দেশই রেলপথের সুবিধা নিয়ে কানেক্টিভিটি বাড়াতে আগ্রহী। এরই অংশ হিসেবে দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে রংপুরের কাউনিয়া সেকশনটি ডুয়েলগেজে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১৮ সালে। ৬৬ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার এ রেলপথের কাজ শেষ হওয়ার কথা চলতি বছরের ডিসেম্বরে। কিন্তু চার বছর পেরিয়ে গেলেও এর অগ্রগতি শূন্য। এতদিনে পরামর্শক নিয়োগ দেওয়াই সম্ভব হয়নি। ফলে থমকে আছে গুরুত্বপূর্ণ এ রেলপথের কাজ।

বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্র জানায়, বিদ্যমান সেকশনটি ১৯৮৭ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত একটি প্রকল্পের মাধ্যমে পুনর্বাসন করা হয়েছিল। বর্তমানে এ সেকশনটির স্লিপারের মেয়াদোত্তীর্ণসহ অন্যান্য অবকাঠামো জরাজীর্ণ। ফলে সেকশন দিয়ে ইন্টারসিটি ট্রেনসহ অন্যান্য ট্রেন যথাযথ গতিতে চলতে পারছে না। এ সেকশনটিতে ডুয়েলগেজ রেললাইনে রূপান্তরিত হলে একই সঙ্গে মিটারগেজ ও ডুয়েলগেজ ট্রেন চলাচল করতে পারবে। ফলে সেকশনাল ক্যাপাসিটি বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সহজ হবে। এছাড়া বাড়বে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যও।

প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে, পরামর্শক সেবা গ্রহণ, ৬০২ মিটার ব্রিজ নির্মাণ ও সিগন্যালিং সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা। রেলপথটিতে মোট ব্যয় হবে ১ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) ১ হাজার ৩৭৬ কোটি ২৪ লাখ এবং সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ৩১৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা ব্যয় হবে। উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে ৫৭ কিলোমিটার মেইন লাইন এবং ৯ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার লুপ লাইন মিটারগেজ থেকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর ঘটবে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে জানায়, প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগের বিভিন্ন পর্যায়ে ভারতীয় এক্সিম ব্যাংকের সম্মতি গ্রহণে দীর্ঘ সময় লেগেছে। ৩১ ডিসেম্বর ২০২২ তারিখে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সুবিধার্থে প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো প্রয়োজন। বিভিন্ন পর্যায়ে ভারতীয় এক্সিম ব্যাংকের সম্মতি গ্রহণে সময় কম লাগলে প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজতর হবে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মাধ্যমে বিষয়টি সুরাহার লক্ষ্যে ভারতীয় এক্সিম ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রয়োজন বলেও জানায় বাংলাদেশ রেলওয়ে।

প্রকল্পের অগ্রগতি প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক ও বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ব্রিজ/পশ্চিম) লিয়াকত শরিফ খান বলেন, দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে রংপুরের কাউনিয়া সেকশনটি ডুয়েলগেজে রূপান্তরের কাজই শুরু হয়নি। অগ্রগতি শূন্য।

চার বছরেও প্রকল্পের কাজ শুরু না হওয়া প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক বলেন, প্রকল্পের কাজ এলওসির (ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিট) আওতায়। ভারত যখন অনুমোদন দেবে তখনই শুরু হবে। ওদের কাছ থেকে টাকা পাওয়া যায়নি। টাকা পেলে পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হবে। এর পরই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব নয় বিধায় প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হবে। দ্রুত সময়ে চূড়ান্ত করা হবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ। এজন্য প্রকল্প পরিচালককে সচেষ্ট থাকতে হবে।

পার্বতীপুর থেকে কাউনিয়া সেকশনে ৫৭ কিমি মেইন লাইন এবং ৯ দশমিক ৮৫ কিমি লুপলাইন মিটারগেজকে ডুয়েলগেজে রূপ দেওয়া হবে। সাতটি স্টেশন বিল্ডিং, ৪৭টি ব্রিজ নির্মাণ (গার্ডার ব্রিজ ১৪টি ও বক্স কালভার্ট ৩৩), চারটি প্ল্যাটফর্ম শেড নির্মাণ করা হবে। এছাড়া স্থাপন করা হবে ছয়টি কম্পিউটার বেজড সিগন্যালিং সিস্টেম।

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তারিখে একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। পরামর্শক নিয়োগের জন্য নোটিশ প্রকাশ করা হয় ১০ মার্চ ২০১৮ তারিখে। ২৬ জুলাই ২০১৮ তারিখে সেটা উন্মুক্ত করা হয়। মূল্যায়নের পর একটি প্রতিষ্ঠান শর্টলিস্টিংয়ের যোগ্য হওয়ায় এটা বাতিলের সুপারিশ করা হয় ১৯ আগস্ট ২০১৮ তারিখে।

ভারতীয় এক্সিম ব্যাংকের সম্মতিতে দ্বিতীয়বার ১৫ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে পরামর্শক নিয়োগে ফের নোটিশ প্রকাশ করা হয়, যা ১৩ নভেম্বর ২০১৮ তারিখে উন্মুক্ত করা হয়। দরপত্র মূল্যায়নের পর তিনটি প্রতিষ্ঠানকে শর্টলিস্টিং করে ভারতীয় এক্সিম ব্যাংকের সম্মতির জন্য পাঠানো হয় ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখে। এতে সম্মতি না দিয়ে পুনরায় নোটিশ জারির অনুরোধ করে এক্সিম ব্যাংক।

বিভিন্ন দফায় আলোচনা ও পত্র যোগাযোগের পর ৩০ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে এক্সিম ব্যাংকের নোটিশের সম্মতি দেওয়া হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখে পুনরায় দরপত্র নোটিশ প্রকাশ করা হয়, যা উন্মুক্ত করা হয় ৮ মার্চ ২০২০ তারিখে। মূল্যায়নের পর ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে সংক্ষিপ্ত তালিকায় আনা হয়, যা এক্সিম ব্যাংকের মাধ্যমে সম্মতি নেওয়া হয় ৩১ আগস্ট ২০২০ তারিখে।

এরপর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির মূল্যায়ন করে ৩১ মার্চ ২০২১ তারিখে এক্সিম ব্যাংকের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হলে ১২ মে ২০২১ তারিখে কিছু পর্যবেক্ষণসহ তা ফেরত দেওয়া হয়। পর্যবেক্ষণ মোতাবেক পুনরায় ২৭ জুন ২০১১ তারিখে এক্সিম ব্যাংকের অনুমোদনের জন্য পাঠালে ৩০ জুন ২০২১ তারিখে সম্মতি দেওয়া হয়। এরপর কয়েকটি নেগোসিয়েশন সভা অনুষ্ঠিত হলেও চূড়ান্ত হয়নি পরামর্শক নিয়োগ। এসব কারণেই মূলত থমকে আছে প্রকল্পের কাজ।

রেলপথ মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আন্তঃদেশীয় রেল যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। উভয় দেশ রেলপথকে নানা দিক থেকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে ভারতসহ নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে রেলওয়ে ট্রানজিট স্থাপন করতে পারবে। চিলাহাটি থেকে পার্বতীপুর হয়ে ঈশ্বরদী পর্যন্ত সেকশনটি ব্রডগেজ। কিন্তু দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে ভারতের রাধিকাপুর ও পার্বতীপুর থেকে কাউনিয়া পর্যন্ত সেকশনটি মিটারগেজ। এ অবস্থায় বিরল সীমান্ত দিয়ে ব্রডগেজ লাইনের মাধ্যমে আন্তঃদেশীয় রেল যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের পার্বতীপুর থেকে কাউনিয়া পর্যন্ত মিটারগেজ রেললাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর’ নামে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। রেলপথটি বাস্তবায়িত হলে উভয় দেশ লাভবান হবে।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত