ভুয়া সনদ বাণিজ্য: প্রবাসীদের টার্গেট করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ

সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের লক্ষ্য করে সংঘবদ্ধভাবে ভুয়া শিক্ষাগত সনদ তৈরির মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে অনলাইনে যাচাইযোগ্য (ভেরিফায়েবল) সনদ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হলেও পরবর্তীতে সনদগুলো যাচাই প্রক্রিয়ায় ধরা পড়ে।
সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতে কিছু ভিসা ক্যাটাগরিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে বিপাকে পড়েন অনেক প্রবাসী। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, মো. রিয়াজ নামের এক ব্যক্তি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি সনদ তৈরি করে দেওয়ার আশ্বাস দেন। শুধু তাই নয়, অনলাইনে যাচাই করলেও তথ্য পাওয়া যাবে বলে তিনি তাদের আশ্বস্ত করেন। এই প্রলোভনে পড়ে অনেকে এক লাখ থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত চুক্তিভিত্তিক অর্থ পরিশোধ করেন।
একাধিক ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টাকা নেওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের রেজিস্ট্রেশন নম্বর ও রোল নম্বর সরবরাহ করা হয়। পরবর্তীতে প্রয়োজন অনুযায়ী সনদের প্রিন্টেড কপিও দেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে অনলাইনে তথ্য মিল থাকায় অনেকেই বিষয়টিকে বৈধ বলে বিশ্বাস করেন।
তবে সমস্যার শুরু হয় সনদগুলো আন্তর্জাতিকভাবে সত্যায়নের (Apostille) জন্য জমা দেওয়ার পর। ভেরিফিকেশন পর্যায়ে দেখা যায়, সনদে ব্যবহৃত তথ্যের সঙ্গে আবেদনকারীর প্রকৃত পরিচয়ের মিল নেই। বিশেষ করে বাবা-মায়ের নাম, জন্মতারিখ এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্যের অসঙ্গতি ধরা পড়ে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি বিভিন্নভাবে সময়ক্ষেপণ ও বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন। এমনকি তথ্য সংশোধনের কথা বলে আবারও অর্থ দাবি করা হয়। কয়েকজন অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করলেও শেষ পর্যন্ত কোনো সমাধান পাননি বলে জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, অভিযুক্ত রিয়াজ দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর নীলক্ষেতকেন্দ্রিক বিভিন্ন অবৈধ সনদ ও নথি তৈরির সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, তার সঙ্গে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের যোগাযোগ রয়েছে, যার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে এই জালিয়াতি পরিচালনা করা হয়।
একাধিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাটাবেজে একই বা কাছাকাছি নামের কোনো শিক্ষার্থী রয়েছে কি না তা খুঁজে বের করা হয়। এরপর সেই প্রকৃত শিক্ষার্থীর রোল নম্বর ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করে অন্য ব্যক্তির জন্য জাল সনদ প্রস্তুত করা হয়। ফলে অনলাইনে প্রাথমিক তথ্য প্রদর্শিত হলেও বিস্তারিত যাচাইয়ে প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু প্রতারণাই নয়, এটি রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থার তথ্য নিরাপত্তা ও সনদের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্যও বড় হুমকি। তারা বিষয়টি নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জরুরি তদন্ত দাবি করেছেন।
এদিকে ভুক্তভোগীরা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ ফেরত পাওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বিদেশগামী বা বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসীদের যেকোনো শিক্ষাগত সনদ তৈরির ক্ষেত্রে সরাসরি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি দপ্তরের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মো. রিয়াজের সঙ্গে তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর ০১৭২১৪৭২৯৪১ যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, তিনি কোনো প্রতারণার সঙ্গে জড়িত নন। তবে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আমার নামে একাধিক মামলা আছে। আরও কয়েকটা মামলা হলে সমস্যা নাই।”
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে তার এমন বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত

