গাজায় স্পেনের পক্ষে উল্লাস!

বিশ্বকাপ ফাইনালে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় রোববার আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে স্পেন। এই ম্যাচ ঘিরে গাজা উপত্যকায়ও ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। অনেক ফিলিস্তিনি সমর্থক স্পেনকে সমর্থন করছেন, কারণ তাদের বিশ্বাস—ফিলিস্তিনের প্রতি স্পেনের রাজনৈতিক ও মানবিক অবস্থানই এই সমর্থনের প্রধান কারণ।
৩৩ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি আহমেদ আল বোজম বলেন, ‘আমি পুরোপুরি স্পেনের পক্ষে। কারণ তারা ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়িয়েছে।’ গাজার অনেক মানুষের মধ্যেই এমন অনুভূতি রয়েছে। এর পেছনে রয়েছে ইসরায়েলের যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিন বিষয়ে স্প্যানিশ সরকারের অবস্থান এবং বার্সেলোনার তারকা লামিনে ইয়ামালসহ স্পেনের কয়েকজন ক্রীড়াবিদের প্রকাশ্য সংহতি।
আল বোজম ইয়ামালের উদ্দেশে বলেন, ‘ফিলিস্তিন থেকে আমরা তোমাকে ভালোবাসি।’ তিনি মে মাসের সেই ঘটনার কথা উল্লেখ করেন, যখন লা লিগা জয়ের পর বার্সেলোনার উন্মুক্ত বাস শোভাযাত্রায় ইয়ামাল ফিলিস্তিনের পতাকা উড়িয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আন্তরিকভাবে তোমাদের সমর্থন করি। আশা করি, তোমরা বিশ্বকাপ জিতবে এবং ফিলিস্তিনের পতাকাও উড়াবে।’
বিশ্বকাপ ফাইনাল ঘিরে বিশ্বজুড়ে যেমন উত্তেজনা বাড়ছে, তেমনি গাজাতেও ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহ তুঙ্গে। তবে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েলি হামলার কারণে টুর্নামেন্টের ম্যাচ দেখা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠেছে।
সাবেক ফুটবলার ও স্টেডিয়াম ব্যবস্থাপক আদনান আল আফিফি বলেন, ‘বিদ্যুৎ থাকলেই কেবল মানুষ খেলা দেখতে পারে। কিন্তু জ্বালানির সংকট ও অতিরিক্ত দামের কারণে জেনারেটরও চালানো যাচ্ছে না। এর মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ ফিলিস্তিনিরা।’
যুদ্ধের কারণে প্রায় হারিয়ে যাওয়া ক্রীড়া পরিবেশ কিছুটা ফিরিয়ে আনতে গাজা সিটির প্যালেস্টাইন স্পোর্টস ক্লাবে বিশ্বকাপ উপলক্ষে প্রদর্শনী ম্যাচের আয়োজন করছেন আল-আফিফি। বর্তমানে এটিই গাজা উপত্যকার একমাত্র সচল ফুটবল ক্লাব, যেখানে খেলোয়াড়রা অনুশীলন ও খেলতে পারেন।
বৃহস্পতিবার ও শনিবার সেখানে ফিলিস্তিন ও স্পেনের প্রতিনিধিত্বকারী দুটি দলের মধ্যে বিশ্বকাপ অনুকরণে দুটি প্রদর্শনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ম্যাচগুলোতে রেফারির পাশাপাশি প্রতীকী ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) ব্যবস্থাও রাখা হয়, যাতে খেলোয়াড়রা আন্তর্জাতিক ম্যাচের পরিবেশ অনুভব করতে পারেন।
৩৭ বছর বয়সী আল-আফিফি বলেন, ‘পুরো পরিবেশ ছিল আবেগ ও ইতিবাচকতায় ভরা। স্পেন জাতীয় দলের প্রতি আমাদের সমর্থনের এটিই ছিল সবচেয়ে বড় প্রকাশ।’
২০২৪ সালের মে মাসে স্পেন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ তখন বলেছিলেন, এই সিদ্ধান্তের লক্ষ্য ছিল ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে এগিয়ে নেওয়া, গাজার মানবিক সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখা, যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।
স্পেন জাতীয় দলের কয়েকজন খেলোয়াড় ও কোচও গাজার মানুষের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন লামিনে ইয়ামাল এবং ম্যানচেস্টার সিটির সাবেক কোচ পেপ গার্দিওলা। ফিলিস্তিনিদের কাছে এসব পদক্ষেপ ফুটবলের গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রতীকী গুরুত্ব বহন করছে।
গাজার পঙ্গুদের ফুটবল দল গাজা আল ইরাদা (গাজা ডিটারমিনেশন)-এর প্রধান কোচ হাতেম আল মাগরিবি বলেন, ‘পুরো ফিলিস্তিনি জাতি চায় স্পেন বিশ্বকাপ জিতুক।’ তিনি বলেন, ‘এই খেলোয়াড়রা তাদের পা বা হাত হারিয়েছে, কিন্তু যারা ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়িয়েছে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা ও সম্মান প্রকাশ করার শক্তি হারায়নি।’
এ সময় তিনি বিশ্বকাপ চলাকালে প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানানোর জন্য মিসরের কোচ হোসাম হাসানকেও ধন্যবাদ জানান।
আল-আফিফিও বলেন, ‘এই সমর্থন আমাদের কাছে অনেক বড়। এতে আমাদের মনে হয়, কেউ অন্তত আমাদের কষ্টটা বুঝতে পারছে।’ আল-আফিফির ভাষ্য, যুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও গাজার ফুটবল ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে এখনো অনেক বাধা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘বাস্তুচ্যুতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে গাজার বড় সব স্টেডিয়ামই এখন অচল।’
গত ২৫ বছরে দক্ষিণের রাফাহ থেকে উত্তরের বেইত হানুন পর্যন্ত গাজার বিভিন্ন বড় স্টেডিয়ামে খেলার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, অনেক স্টেডিয়াম ধ্বংস হয়ে গেছে, আর অনেকগুলোকে বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়েছে।
বর্তমানে গাজায় ফুটবল সীমাবদ্ধ রয়েছে ছোট আকারের পাঁচজনের (ফাইভ আ সাইড) মাঠে। খেলোয়াড়দের খেলার সঙ্গে যুক্ত রাখতে ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন সেখানে ছোট ছোট স্থানীয় টুর্নামেন্ট আয়োজন করছে। যুদ্ধ, ধ্বংসযজ্ঞ ও গভীর মানবিক সংকটের মধ্যেও বিশ্বকাপ চলাকালে ফুটবল গাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। অন্তত ৯০ মিনিটের জন্য হলেও যুদ্ধের বাস্তবতা ভুলে থাকার একটি সুযোগ করে দিচ্ছে এই খেলা।
আল-আফিফি বলেন, ‘সবাই বড় ম্যাচগুলো দেখতে চায়, বিশেষ করে ফাইনাল।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠন ও সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে গাজার বিভিন্ন স্থানে ফাইনাল ম্যাচটি বড় পর্দায় দেখানোর ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘স্পেন ফিলিস্তিনি ইস্যুর পাশে দাঁড়িয়েছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে বিষয়টি তুলে ধরেছে। আমরা আশা করি, বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে তারা এর প্রতিদান পাবে।’
স্পেনকে সমর্থন করলেও সেটিকে আর্জেন্টিনার প্রতি বিদ্বেষ হিসেবে দেখতে চান না আল আফিফি। যদিও আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেয়ের ইসরায়েল-সমর্থন এবং তার কিছু বক্তব্য ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘যে দেশ থেকেই আসুক, আমরা সব জাতীয় দলকেই সম্মান করি। আর্জেন্টিনা ফুটবলের একটি বড় শক্তি, প্রতিভা ও পারফরম্যান্সের দিক থেকে তারা একটি আদর্শ। স্পেনকে সমর্থন করার অর্থ এই নয় যে আমরা আর্জেন্টিনার শত্রু। তাদের জন্যও শুভকামনা রইল।’
অন্যদিকে হাতেম আল মাগরিবির মতে, ফাইনাল হবে কঠিন। তার ভাষায়, ‘লিওনেল মেসির কারণে আর্জেন্টিনা হয়তো কিছুটা এগিয়ে থাকবে।’ তবে আহমেদ আল-বোজম স্পেনের সম্ভাবনা নিয়েই বেশি আত্মবিশ্বাসী।
তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা, অতিরিক্ত সময়ে স্পেন ৩-১ ব্যবধানে জিতবে। নির্ধারিত সময় ১-১ থাকবে, এরপর অতিরিক্ত সময়ে স্পেন আরও দুটি গোল করবে।’
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত

